বিএনপি-জামায়াত কর্মীদের অমানবিক নির্যাতন করা সুনামগঞ্জ দিরাই থানার ওসি আমিনুল ইসলামের অবৈধ সম্পদের পাহাড়
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০১-১১-২০২৬ ০১:১১:৫১ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০১-১১-২০২৬ ০১:১১:৫১ অপরাহ্ন
বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিকানা অর্জন, সুরমা ও ধোপাজান নদী থেকে বালু লুট ও চাঁদাবাজির আশ্রয়দাতা হওয়া এবং বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে চরম বেপরোয়া আচরণ ও মিথ্যা মামলা দিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলমত দমনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সুনামগঞ্জের দিরাই থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সুনামগঞ্জে অবস্থানকালে বিএনপি ও জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের ওপর নৃশংস পুলিশি নির্যাতন, ঘরবাড়িতে হামলা, সাজানো মামলায় গ্রেফতার বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে তিনি শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে অনুসন্ধানে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পুলিশ পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম (বিপি নং-৭৫০২০০৮৬৮৩) সুনামগঞ্জ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের উপত্যকা হাসননগরে (শান্তিবাগ) নিজের নামে ‘এ.আর.এস মহল’ নামে পাঁচতলা বিশিষ্ট একটি বিলাসবহুল প্রাসাদোপম বাড়ি নির্মাণ করেছেন। সুনামগঞ্জ পৌরসভার হোল্ডিং নম্বর-১৮১ সম্বলিত বাস ভবনটির কর পরিশোধ নথিপত্র অনুযায়ী, ষোলঘর মৌজায় বাড়িটির মালিক আমিনুল ইসলাম এবং তাঁর পিতার নাম সিদ্দিকুর রহমান। তিনি ২০২২-২০২৩ অর্থ বছর থেকে চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছর পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর বছরে ৭ হাজার ৯১৪ টাকা হারে পৌর কর পরিশোধ করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, শহরের মূল সড়কের পাশে অবস্থিত ওই এলাকার প্রতি শতক জমির বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ১৩ থেকে ১৫ লাখ টাকা। ৮ শতক জমির ওপর নির্মিত সাত কোটি টাকা মূল্যের এই সুরম্য অট্টালিকা ছাড়াও সুনামগঞ্জ ও সিলেটের বিভিন্ন মূল্যবান এলাকায় তাঁর নামে-বেনামে আরও বিপুল জমি ও অবৈধ সম্পত্তি রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্পদের বিষয়ে দিরাই থানার ওসি আমিনুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বাড়ির সত্যতা স্বীকার করে দাবি করেন, বাড়িটি ব্যাংকের ঋণ নিয়ে করা হয়েছে এবং এখনও তিনি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করছেন। তবে ঠিক কোন ব্যাংক থেকে এবং কবে কত টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে, সে প্রশ্নের জবাবে তিনি স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি। বিরোধী দল দমনের বিষয়ে তিনি সাফাই গেয়ে বলেন, “আমরা সরকারের চাকরি করি। চাকরিকালে যার পক্ষে কাজ করি তিনি খুশি হন, আর যার বিরুদ্ধে যায় তিনি ক্ষেপে যান। হয়তো সেরকম কিছুই ঘটেছে।”
**ফ্যাসিস্ট আমলে বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের ওপর তাণ্ডব:**
নথিপত্র ও ভুক্তভোগীদের ভাষ্য মতে, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সুনামগঞ্জ জেলা শহরে ওসি আমিনুল ছিলেন এক মূর্তিমতি আতঙ্ক। তাঁর ভয়ে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা দিনের পর দিন ঘরছাড়া ছিলেন।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ডামি নির্বাচনের ঠিক আগে জেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম, সদস্য সচিব তারেক মিয়া ও সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ মো. ফরহাদসহ শীর্ষ নেতারা শান্তিবাগে এক বাসায় আশ্রয় নিলে ওসি আমিনুলের নির্দেশে পুলিশ পুরো এলাকা ঘেরাও করে তাদের ওপর বেধড়ক শারীরিক নির্যাতন চালায় এবং জেলহাজতে পাঠায়। একইভাবে ২০১৮ সালে জেলা জামায়াত কার্যালয় (ইসলামিক সেন্টার), জেলা আমীর ও সেক্রেটারির বাসায় হামলা-ভাঙচুর পরিচালনা এবং জেলা শিবির সভাপতি কুদরতে এলাহী মারুফকে লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালানোর ঘটনায় নেতৃত্ব দেন এই আমিনুল।
সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ মো. ফরহাদ বলেন, আওয়ামীলীগ শাসনামলে পুলিশ কর্মকর্তারা বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের দৌড়াবে এটা স্বাভাবিক বিষয়। এনিয়ে কারও বিরুদ্ধে রাগ বা ক্ষোভ থাকার কথা নয়। কিন্তু এই পুলিশ কর্মকর্তার বিষয় ভিন্ন। ওসি আমিনুল ইসলাম কতটা বেপরোয়া ছিল সুনামগঞ্জের বিএনপি,ছাত্রদলসহ আমাদের নেতাকর্মীরা এর সাক্ষী। তার নির্যাতন ছিল ভয়াবহ। তার কারণে ঘরবাড়িতে এক মুহূর্তের জন্যেও অবস্থান করা সম্ভব হয়নি।পৌরসভা নির্বাচনের প্রচারণাকালে সে ধানের শীষের লিফলেট পর্যন্ত বিতরণ করতে দেয়নি। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের ঘটনার বর্ননা দিয়ে তিনি বলেন,আমরা ভেবেছিলাম যেহেতু তিনি বিএনপি নেতার আত্মীয় পরিচয় দেন তাহলে তিনি হয়তো বিপদের সময় কিছুটা হলেও নমনীয় হবেন কিন্তু ঘটনা হল এর উল্টো। তার স্ত্রী পুলিশ ডেকে এনে আমাদের ধরিয়ে দেন। আমিসহ ছাত্রদলের জেলার শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে পেটানো হয়।
শাহ ফরহাদ বলেন,স্বৈরাচারের শাসনামলে প্রশাসনে থাকা অতিউৎসাহী ‘ডেভিল’ পুলিশ কর্মকর্তাকে ওসির দায়িত্ব দেওয়ায় সত্যিই হতবাক হয়েছি। তিনি তার অতীত কর্মকান্ডের তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সরকারের নিকট দাবী জানিয়েছেন।
সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেকআহবায়ক জাহাঙ্গীর আলম আক্ষেপ করে বলেন,এসব অতীত দিনের ঘটনা। আমরা এর সাথে জড়িতদের যথাযথ বিচার চাই।
সুনামগঞ্জ পৌর জামায়াতের আমীর এ্যাডভোকেট আব্দুস সাত্তার মামুন বলেন, এই পুলিশ কর্মকর্তার মাঝে নুন্যতম পেশাদারিত্ব ছিল না। এজন্যে সে আমাদের সাথে এরকম কর্মকাণ্ড করে গেছে। সাধারণ লোকজনকে ধরে নিয়ে তারপর টাকা নিয়ে ছেড়ে দেবার ঘটনা ছিল তার নিয়মিত কাজ।
সে জামায়াতের অফিসে ভাংচুর করে। পুলিশ প্রশাসনের উচিত হবে এরকম দোষী কর্মকর্তাদের তদন্ত করে ব্যবস্হা গ্রহণ করা এবং যোগ্য, মানবিক কর্মকর্তাদের পোস্টিং দেয়া। এতে মানুষ উপকৃত হবেন, আইনশৃংখলা পরিস্থতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
সাবেক ছাত্রশিবির নেতা কুদরতে এলাহী মারুফ বলেন, একমাত্র আল্লাহর দয়ায় বেঁচে আছি না হয় সেদিন পুলিশের গুলিতে শহীদ হতাম। ওসি আমিনুল ওই ঘটনার নেতৃত্বে দেন। মারুফ বলেন,ওসি আমিনুলের কত ঘটনা বলব। তার প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করতে হবে। তাহলে মূল রহস্য উদঘাটন হবে তিনি কি পেশাদার ছিলেন নাকি “সন্ত্রাসী” ছিলেন।
বিষয়টিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সুনামগঞ্জ জেলা সাধারণ সম্পাদক ফজলুল হক সাঈদ বলেন, “বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে বিরোধী দলমত দমনে অতিউৎসাহী যেসব কর্মকর্তা ছিলেন, আমিনুল তাদের মধ্যে অন্যতম। দুর্নীতির পাহাড় গড়া এ ধরনের কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ ওসির পদে বহাল রেখে বর্তমান সরকারের পক্ষে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তিনি সুযোগ পেলেই অপশক্তিকে মদদ দিয়ে সরকারকে বিব্রত করবেন। অবিলম্বে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠানো আর্থিক ও পুলিশি নির্যাতনের সমস্ত অভিযোগের বিভাগীয় ও আইনি তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।”
নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload
কমেন্ট বক্স